চিকিৎসা জগতের এক নতুন বিস্ময়ঃ কৃত্রিম মধ্যমস্তিষ্ক আবিষ্কার!

আধুনিক বিজ্ঞান থেমে নেই। চলছে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে, যেমন সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে গ্রহ-উপগ্রহ ও অসংখ্য গ্যালাক্সিপুঞ্জ নিয়ে চলছে মহাবিশ্ব। যার কেন্দ্রে সূর্য দাঁড়িয়ে করে যাচ্ছে সময়ের বন্টন প্রণালী। আর বলছে, “পৃথিবী, তুমি ৩৬৫ দিনে আমাকে কেন্দ্র করে ঘুরবে। আর শুধু আমার চারদিকে ঘুরলে হবেনা। নিজ অক্ষের উপরও ঘুরতে হবে এবং এতে সময় নিবে ২৪ ঘন্টা।” তারপর থেকে শুরু পৃথিবীর ঘুর্ণন প্রক্রিয়া। আচ্ছা সৌরজগতকে শাসন করছে রাজা রুপ সূর্য। তাহলে আমাদের শরীরকে কে শাসন করছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। সেটা হল আমাদের মস্তিষ্ক। আমাদের সব কাজের ঠিকঠাক মনিটরিং করছে এ ক্ষুদ্র অঙ্গটি, যা আমাদের জানা সম্ভব হয়েছে বিজ্ঞানের বিপ্লবের মাধ্যমে। অনেক সময় বিজ্ঞান আমাদের এমন কিছু দেখায় যা দেখে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারিনা। তেমনি একটি চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো গবেষণাগারে কৃত্রিম মধ্যমস্তিষ্ক তৈরী করা, যা সিঙ্গাপুরের একদল গবেষক করে দেখালেন। চলুন তবে পরিচিত হই তাদের এ সফলতার সাথে। আবিষ্কারটির সাথে পরিচিত হবার আগে আমরা জানবো মধ্যমস্তিষ্ক কী?

160730154504_1_900x600

চিত্রঃ গবেষণাগারে আবিষ্কৃত মধ্যমস্তিষ্ক

মধ্যমস্তিষ্ক কী?

স্নায়ুতন্ত্রের গঠন ও কাজের একক হলো নিউরন, যার মাধ্যমে মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ করছে আমাদের পুরো শরীরকে। মস্তিষ্ক প্রধানত তিনটি অংশে বিভক্ত। সামনের বড় অংশ হলো অগ্রমস্তিষ্ক, যা সেরেব্রাম থেকে হাইপোথ্যালামাস পর্যন্ত বিস্তৃত এবং শেষের সেরেবেলাম থেকে শুরু করে পনস পর্যন্ত অংশকে পশ্চাৎমস্তিষ্ক বলে। আর মাঝখানের অংশে সেরেব্রাল পেডাঙ্কল, কর্পোয়া কোয়াড্রিজেমিনা ও সেরেব্রাল অ্যাকুইডাক্ট, সুপিরিয়র কলিকোলাস এবং ইনফেরিয়র কলিকোলাস নিয়ে গঠিত মধ্যমস্তিষ্ক। যার প্রধান কাজ অগ্র ও পশ্চাৎ মস্তিষ্কের মধ্য যোগসূত্র রচনা করা এবং দর্শন, শ্রবণ ও প্রতিবেদন সৃষ্টি করা। একে অনেক সময় মেসেনসেফালনও বলা হয়। তাছাড়া ভালবাসার আবেগের কারসাজিও কিন্তু এ মধ্যমস্তিষ্কেরই। মধ্যমস্তিষ্কের ‘ডোপামিনারজিক নিউরন’ নামক এক প্রকার নিউরন আছে যা ডোপামিন তৈরীতে ভূমিকা রাখে। আর এ ডোপামিনই ভালবাসার আবেগ তৈরীর প্রধান নায়ক।

the-brain-stem-mid-brain-dorsal-view-superior-quadrigemina-of-tectum-superior-cerebellar-peduncle

চিত্রঃ মধ্যমস্তিষ্ক

 

কৃত্রিম মধ্যমস্তিষ্ক আবিষ্কার ও এর প্রভাবঃ

মস্তিষ্ক নিয়ে অনেক বকবক করা হলো। এবার আসা যাক কৃত্রিম মধ্যমস্তিষ্ক আবিষ্কারের গল্পে। আগেই বলা হয়েছে এ মহৎ কাজটি সিঙ্গাপুরের একদল গবেষকদের সফলতা। বেশীদিন আগের কথা না। চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষের দিকের কথা। গবেষকরা এমন এক কৃত্রিম মধ্যমস্তিষ্ক আবিষ্কার করেছেন যা পুরো বিজ্ঞান তথা চিকিৎসা জগতকে তাক লাগিয়ে দেয়ার মতো! যা অবিকল মানব মধ্যমস্তিষ্কের মত কাজ করবে। বিজ্ঞানীরা এ আবিষ্কারটি করেছেন মস্তিষ্কের স্টেম সেলের বৃদ্ধি প্রক্রিয়া সচল করে। এছাড়া এ কৃত্রিম অংশে ডোপামিনারজিক নিউরন এবং নিউরোমেলানিন নামক দুটি হরমোনের কাজও তারা প্রয়োগ করে দেখান। নব আবিষ্কৃত এ অঙ্গটির আকৃতি প্রায় ২-৩ মিলিমিটারের মতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এ আবিষ্কার মানবজাতির জন্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

এ গবেষণায় যুক্ত Duke-NUS Medical School-এর অধ্যাপক Dr. Shawn Je এর উত্তরেবলেন, “নব আবিষ্কৃত এ মধ্যমস্তিষ্কটি আমাদের সাধারণ মস্তিষ্কের মতো কাজ করছে। এর কোষগুলো বিভাজিত হচ্ছে। স্তরে স্তরে ক্লাস্টার গঠন করছে এবং এরা স্বাভাবিক পরিবেশে রাসায়নিক ও বৈদ্যুতিকভাবে সক্রিয়।” তিনি আরো বলেন, “কোনো নতুন প্রতিষেধক আবিষ্কারের সময় তা সরাসরি মানুষের মাঝে প্রয়োগ না করার জন্য এ কৃত্রিম মস্তিষ্ক সাহায্য করবে। ফলে মারাত্মক ঝুঁকি কমে যাবে এবং চিকিৎসা জগতের এক নতুন বিপ্লব দেখা যাবে।” ডোপামিনারজিক নিউরন এবং নিউরোমেলানিন হরমোন পারকিনন্সনস রোগ নিয়ে গবেষণা করতে সাহায্য করবে। তাছাড়া মধ্য-মস্তিষ্কের প্রতিস্থাপন নিয়েও গবেষণা চালানো যাবে এ আবিষ্কারের মাধ্যমে।

মোট কথা, আগামীর চিকিৎসা জগতকে এক নতুন বিপ্লব এনে দিবে এ কৃত্রিম মস্তিষ্কটি। পার্কিনন্সনস রোগসহ বহু মারাত্মক রোগের গবেষণায় এ মস্তিষ্কটি এক অভূতপূর্ব সমাধান দিবে বলে আশা করেন বিজ্ঞানীরা।

তথ্যসূত্রঃ

১। https://www.sciencedaily.com/releases/2016/07/160730154504.htm

২।  www.wikipedia.org/ mid-brain

৩। Human Anatomy

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!