জিকা ভাইরাসঃ চিকিৎসা জগতের এক নতুন রহস্য!

বাড়ির ফুলধানি যখন পানি দিয়ে ভরিয়ে রাখা হয় তখন মুরব্বিদের কাছে একটা পরিচিত কথা প্রায় শুনা যায়। “পানি জমিয়ে রাখবা না। রাখলে ডেঙ্গু হবে।” কথাটা শুনে আমাদের কৌতূহলি মন জানতে চায়-ডেঙ্গু, সেটা আবার কি! তখন থেমে থাকেনা আমাদের মস্তিষ্ক। বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরনের সাহায্যে অনুসন্ধানে নেমে পড়ে এবং জিজ্ঞেস করে বসে, “ডেঙ্গু কি?” উত্তরে সবাই বলে এক প্রকার রোগ; যা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। আবারও কৌতূহলি মন তাড়া দেয়। মশার মাধ্যমে ছড়ায়! কিভাবে? যার উত্তরে বেরিয়ে আসে পরিচিত সেই এডিস মশার বিখ্যাত কাহিনী। তারপর শুরু হয় ডেঙ্গু জ্বরের সেই বিশাল ইতিহাস। যে জ্বরের ইতিহাস পার করে আজ আমরা একবিংশ শতাব্দিতে নিত্য নতুন রহস্য উম্মোচনে ব্যস্ত। রহস্যের সাথে যেন আমাদের এ এক নিবিড় সম্পর্ক। তারা হাতছানি দেয়। আর আমরা জট খুলি। যার মধ্যে জিকা ভাইরাসও একটি। বর্তমান বিশ্বে যা এক আতঙ্কের নাম হিসেবে পরিচিত।

জিকা ভাইরাস কি?

জিকা হল Flaviviridae পরিবারের অন্তর্ভূক্ত Flavivirus গণের এক ভাইরাস প্রজাতি। যা একটি একসূত্রক  RNA ভাইরাস। এরা ডায়ামিটার স্কেলে ৪০ ন্যানোমিটারের মত দীর্ঘ হয়ে থাকে। ভাইরাসটা যখন মানুষের শরীরে কার্যকর হয় তখন শুরু হয় জিকা জ্বর। অনেক সময় একে জিকা ইনফেকশনও বলে থাকে। জিকা ভাইরাসের সাথে ডেঙ্গু জ্বর, পীত জ্বর, জাপানিজ এনেসফালাইটিস এবং ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস-রোগের বিশেষ মিল পাওয়া যায়। আর সবচেয়ে বেশী মিলটা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে।

জিকা ভাইরাস বিস্তার ও এর ইতিহাস

ঊনশবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। বিজ্ঞানীরা এমন এক ভাইরাসের  সন্ধান পেল যা ডেঙ্গুর মত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কথার কথায় বলা যায় ডেঙ্গুর জাত ভাই। ১৯৪৭ সালের দিকে উগান্ডার জিকা ফরেস্টে এ ভাইরাস রেসাস বানর থেকে এডিস মশাদের শরীরে প্রবেশ করে। উগান্ডার জিকা ফরেস্টের নামানুসারে যার নাম দেয়া হয় জিকা ভাইরাস। ১৯৫০ সনের দিকে সর্বপ্রথম আফ্রিকা ও এশিয়ার নিরেক্ষরেখা বরাবর অঞ্চলে বসবাসরত কিছু  মানুষের শরীরে এর উপস্থিতি পাওয়া যায়। পরে ১৯৫২ সালের দিকে একে দেখা যায় নাইজেরিয়া অঞ্চলে রোগ তৈরী করতে। তারপর থেকে শুরু হয় এর বিস্তার প্রক্রিয়া। ছড়ানোর জন্য তাদের বেশ সুবিদাও হয়েছে। একদিকে এডিস গণের মশা, অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষ। জেনে রাখা ভাল যে এডিস গণের মশারা সাধারণত দিনে কামড়ায়। যার সবচেয়ে প্রচলিত উদাহরণ হল এডিস এজিপ্টি। তবে এডিস গণভূক্ত এশিয়ার টাইগার মশারাও কিন্তু এর বিস্তার প্রক্রিয়াতে পিছিয়ে নেয়। তারাও বয়ে নিয়ে চলে এ ভাইরাসটাকে।

জিকা বহনকারী এডিস গণের মশারা যখন একজন সুস্থ মানুষকে কামড়ায় তখন এ রোগে আক্রান্ত হয়। ফলে রোগীর রক্তে ছড়িয়ে পড়ে এ ভাইরাসটা। তবে মশকি ছাড়াও মায়ের কাছে থেকে সন্তানে। এমনকি যৌনমিলনের মাধ্যমেও এ ভাইরাস ছড়ায় বলে ধারণা করেন বিজ্ঞানীরা। নিচের ছবিটার দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

zika-virus-infographic-transmission-vector-medical-concept-flat-style-68643023

চিত্রঃ জিকার বিস্তার প্রক্রিয়া।

 

জিকা ভাইরাস ও মানবজাতির আতঙ্ক!

জিকা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা খুবই কম। মৃত্যুর সম্ভাবনা কম হলেও কিন্তু এ ভাইরাস খুব ভয়াবহ! কিন্তু কেন এ ভাইরাস এতটা ভয়াবহ? মারাত্মক না হলে ভয়াবহ হওয়ার কারণ কি? চলুন তবে এসব প্রশ্নের জটগুলো খোলার চেষ্টা করি।

১। জিকা ভাইরাস ও জিবিএসঃ আচ্ছা জিবিএসের নাম শুনেছেন তো? যার পূর্ণ নাম Guillain Barre Syndrome. এটা এমন এক রোগ; যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তিকে, অপশক্তি বানিয়ে দেয়। অর্থাৎ রোগজীবাণুর বিরোদ্ধে না লড়ে, রোগজীবাণুর বন্ধু হয়ে আমাদের শরীরের বিরোদ্ধে যুদ্ধ করে এবং আস্তে আস্তে ধ্বংস করতে থাকে আমাদের শরীরের স্নায়ুকোষকে। যার ফলে মাংসপেশীর দুর্বলতা, এমনকি প্যারালাইসিস পর্যন্ত হয়ে থাকে। কিন্তু এর সাথে জিকার কি সম্পর্ক? হ্যাঁ, বিজ্ঞানীরা আধো এর সাথে জিকার সম্পর্কের সঠিক কারণ বের করতে পারেননি। তবে যেখানে জিকা, সেখানে জিবিএসকে দেখার কারণে বিজ্ঞানীদের কাছে খটকা লাগে। তাই তাঁরা আবছা ধারণা করছেন যে জিকা ভাইরাসের পার্টনার হিসেবে জিবিএস চলছে। হয়ত গবেষণায় কোন এক সময় বেরিয়ে আসতে পারে জিকা দ্বারা জিবিএস সৃষ্টির কারণ।

২। মা-শিশু সম্পর্কের মধ্যে জিকা ভাইরাসের প্রভাবঃ এতক্ষন পর্যন্ত যে আতঙ্কের কথা বলছিলাম সেই আতঙ্কের ধারপান্তে আমরা। আর সেটা হল গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মায়ের শরীর থেকে জিকা ভাইরাস সন্তানের দেহে প্রবেশ করা এবং ভাইরাসটি মস্তিষ্কের এমন কিছু কোষের বিরুদ্ধে কাজ করে, যা মস্তিষ্কের উন্নয়নে বাধা দেয়। ফলে মাইক্রোসেফালি নামক ভয়ংকর এক জন্মগত ত্রুটি নিয়ে সন্তানরা পৃথিবীর আলো দেখে। তাই তাদের মাথাটা স্বাভাবিক মাথার তুলনায় ছোট হয়ে থাকে। দুঃখের বিষয় এই যে, এদের মধ্যে শতকরা ৮৫ ভাগ শিশুর উপর মাইক্রোসেফালি এক বিরুপ প্রভাব তৈরী করে। তাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ, বুদ্ধি-প্রতিবন্ধীসহ নানা ধরণের স্নায়ুবিক অক্ষমতা তৈরী করে দেয়। আর বাকি ১৫ ভাগ শিশুর মাথা ছোট হলেও এরা ভাগ্যক্রমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করেতে পারে বলে দেখা যায়। গর্ভবতী মহিলা থেকে শিশুর দেহে জিকা ভাইরাস ছড়ানোর তথ্যটা প্রথম আসে ব্রাজিল থেকে। যেখানে চার হাজারেরও বেশী শিশু এ রোগে আক্রান্ত হয় এবং এদের মধ্যে ৩০-৪০ জনের মৃত্যুও ঘটে। যার কারণে ব্রাজিল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে শিশু জন্মানোর জন্য নিষেধ করা হয়েছে। আর একটা কারণ হল- মানুষের রক্তে ও শুক্রাণুতে জিকা ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া। তবে এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের হাতে তেমন টনক নড়ার মত কোন রিপোর্ট নেই। তারপরও সতর্ক থাকার জন্য সবাইকে বলা হয়েছে।

zika-virusaaeaaqaaaaaaaazxaaaajge0zwrkmwnjltg3odetngyxnc1imzawltu4ztk2m2uxy2exoq

জিকার বিস্তারে কি বাংলাদেশ হুমকির মুখে?

বর্তমানে জিকা ভাইরাস যেভাবে বিস্তার লাভ করছে তাতে যে আমরা হুমকির মুখে নাই, তা বলা একেবারে ভূল নয়। তারপরেও প্রশ্ন জাগে আমরা কি হুমকির মুখে? বিজ্ঞানীদের মতটাই বলি। তাঁরা বলছে বর্তমানে বিশ্বে জিকার হুমকির মুখে না এমন কেউ নেই। তবে আনন্দের বিষয় এই যে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জিকা এসে পৌঁছায়নি। আমরা যদি সচেতন থেকে থাকি তবে এ জিকা শক্তির হাত থেকে আমরা অবশ্যই রেহাই পাব। নিচের ছবিতে সাম্প্রতিক জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত এলাকাসমূহ দেখানো হল।

30c7803a00000578-3425846-zika_virus_is_common_in_parts_of_africa_and_south_east_asia_but_-a-19_1454356539781

চিত্রঃ জিকা ভাইরাস আক্রান্ত এলাকাসমূহ।

জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত লক্ষণসমূহ।

ডেঙ্গুর জাত ভাই জিকার লক্ষণগুলোও প্রায় তার মত। স্বাদে কি আর জাত ভাই বলে! যাহোক প্রধান লক্ষণগুলোর মাঝে জ্বর, চোখ উঠা, হাড়ের সংযোগস্থলে ব্যাথা, শরীরে লালচে দাগ, কনজাংটিভাইটিস, ফুস্কুড়ি, অবসাদগ্রস্ততা, মাংস পেশীতে ব্যাথা এবং মাথা ব্যাথা ইত্যাদি। জিকা প্রথম দিকে কাজ করে নীরব ঘাতকের মতো। হঠাৎ করে বুঝে উঠা যায়না এর লক্ষণগুলো। আস্তে আস্তে প্রকাশ পায় এর উপসর্গ। অনেকে উপসর্গগুলো দেখে অন্য রোগের সাথেও গুলিয়ে ফেলে। তাই সন্দেহ হলেই রক্ত পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেয় ডাক্তাররা। আর স্থায়িত্বকালের দিক দিয়ে এ রোগের ভাইরাস এক বছর পর্যন্ত ঠিকে থাকে। তবে তেমন সক্রিয়ভাবে না। তবে হ্যাঁ, জিকা ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট রোগ ২-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

আক্রান্ত হলে করণীয়।

আপাতত এর প্রধান চিকিৎসা হিসেবে বিশ্রামকে প্রাধান্য দিচ্ছে ডাক্তাররা। কারণ এর জন্য কোন টিকা বা প্রতিষেধক বের হয়নি। তাছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন ডাক্তাররা। যেন পানিশূন্যতা সমস্যায় না পড়া হয়। বিশেষ করে এর কোন ঔষুধ না থাকার কারণে সাধারণ প্যারাসিটামল ও অ্যান্টিবায়োটিক ঔষুধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত দেয় মেডিসিন বিশেজ্ঞরা। তবে অ্যাসপিরিন যেন কোনভাবে এ রোগের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

জিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

জিকার ভয়াবহতা নিয়ে বর্তমানে বেশ আলোচনা চললেও এখনো পর্যন্ত এর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই বলে পৃথিবীবাসী যে হাত গুটিয়ে বসে আছে তা না। তবে একেক দেশে একেক রকমভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরী করছে। যা উপরের আলোচনায় দেখলেন। ব্রাজিল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকাতে শিশু জন্ম দেয়া নিষেধ করেছে। কারণ সেখানে জিকার বিস্তারটা বেড়ে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের মত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা আপাতত প্রাথমিক পর্যায়ের। যেমন বসত বাড়ির আশেপাশে পানি জমা না রাখা, দিনের বেলায় মশারী টানিয়ে ঘুমানো, কীটনাশক ব্যবহার করা, বাড়িতে মশকি দূরীকরণের স্প্রে করা ইত্যাদি। আর আক্রান্ত ব্যক্তি হতে রক্ত নেয়া কিংবা যৌনমিলন থেকে বিরত থাকা।

এসব কাজ যদি আমরা ঠিকমত করি তবে হলফ করে বলা যায় যে জিকা আমাদের তেমন ভয়াবহ অবস্থায় ফেলতে পারবেনা। আপনাদের সুস্থতা কামনায় শেষ করলাম আজকের জিকার গল্প। জিকা ভাইরাস নিয়ে কোন প্রশ্ন থাকলে যোগাযোগ করতে পারেন।

তথ্যসূত্রঃ

১। https://en.wikipedia.org/wiki/Zika_virus

২। http://www.webmd.com/a-to-z-guides/zika-virus-symptoms-prevention

৩। http://www.livescience.com/53950-zika-virus-may-infect-kill-neural-stem-cells.html

৪। https://www.sciencedaily.com/releases/2016/06/160604050957.htm

৫। http://www.cdc.gov/zika/about

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!