ধরে ধরে আমরা ধরিত্রীর এক দশমাংশ বন ধ্বংস করেছি শেষ দুই দশকে

অধিকাংশ মানুষের কাছে পরিবেশ সংরক্ষণ বলতে যে ধারণাটা মাথায় আসে তা হল পান্ডাকে সংরক্ষণ করা, বাঁচিয়ে রাখা বা কোনো হুমকির মুখে থাকা প্রাণীর আবাসের জন্য কাজ করা, অথবা এমন প্রাণীদের বাসস্থান ধ্বংসকে প্রতিরোধ করা।

 বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য, ধ্বংসের হার বিপদজনক মাত্রায়

বনাঞ্চল ও জীববৈচিত্র্য, ধ্বংসের হার বিপদজনক মাত্রায়

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডের প্রফেসর জেমস ওয়াটসন বনাঞ্চল ধ্বংসের উপর আরো সাত জন গবেষকের সাথে মিলে এক গবেষণাপত্রে ২০ বছরের পরিবেশ ধ্বংসের নমুনা ও তথ্য প্রকাশ করেছেন। জেমস ওয়াটসন বলেন মানুষ প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের বড় চিত্রটি ধরতে পারছে না। তাঁরা ১৯৯৩ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত সময়ে পৃথিবীর বিরানভূমির ব্যাপ্তির উপর খতিয়ান চালিয়ে দেখিয়েছেন যে, দক্ষিণ আমেরিকায় এ ধ্বংসের হার ২৯.৬%, আফ্রিকায় ১৫% এবং বৈশ্বিকভাবে ৯.৬%।

বন উজাড়ের উপর অতীতে অনুরূপ গুরুত্বারোপ করা হয়েছিল। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ক জীববিজ্ঞানী টিম নিউবোল্ডবলেন,

এই কাজটি প্রথম যেখানে কেউ ক্ষতির পরিমাণ সংখ্যায় নিরুপণ করে দেখিয়েছেন।

নিউবোল্ডের গবেষণাও এমনটাই, তিনি দেখিয়েছেন যে পৃথিবীর বিজনপ্রদেশগুলো নির্বিঘ্ন জীববৈচিত্র্য ধারণ করে। অর্থাৎ আমরা মানুষেরাই যত নষ্টের গোড়া!
এমন জনহীন প্রান্তরগুলো আবার জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে সংকটপূর্ণ দশায় আছে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরোতে অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর সাস্টেইন্যাবিলিটির পরিবেশবিদ রবিন চ্যাজডন বলেন, একারণে এটি একটি হুঁশিয়ারি সংকেত।

অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ডে অবস্থিত ওয়াইল্ডলাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটির জীবভূতাত্ত্বিক পরিবেশবিদ ওয়াটসন এবং তাঁর সহকর্মীরা মিলে পৃথিবীতে মানুষের পদচিহ্নের ব্যাপ্তি নির্ধারণ করে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। এর জন্য অনেকগুলো নিয়ামকের তথ্যকে একত্রিত করা হয়েছে মানচিত্রে: শস্যক্ষেত, চারণভূমি, রাতের আলো, রেলপথ, রাস্তাঘাট, নাব্য জলপথ, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশ( এর মাঝে অন্তর্ভুক্ত শহর এলাকা ও অন্যান্য স্থায়ী আবাস)। বিজনভূমির এই হুমকিগুলোর বের করতে তারা ব্যবহার করেছেন কৃত্রিম উপগ্রহ এবং অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য যা সংরহ করা হয়েছে ১৯৯০ এর শুরু থেকে ২০০০ এর দশকের শেষদিক পর্যন্ত। ওয়াটসন এবং তাঁর সহকর্মীরা নেচারে প্রকাশিত ১৬ বছরে মানুষের পদচিহ্নের কারণে বিশ্বব্যাপী স্থলজ পরিবর্তনে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এর প্রভাবের উপর গবেষণাপত্রে দেখিয়েছেন যেখানে উক্ত নিয়ামকগুলোর মধ্যে কেবল রাস্তাঘাট এবং নাব্য জলপথ লক্ষণীয়ভাবে বাড়েনি।

(a) ২০০৯ এ বিশ্বব্যাপী মানববিস্তারের মানচিত্র ০-৫০ স্কেলে নীল থেকে লাল রঙ দিয়ে প্রদর্শিত (b) ১৯৯৩-২০০৯ সময়কালে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার বিজনভূমির উন্নতি অবনতি দেখানো হয়েছে।

(a) ২০০৯ এ বিশ্বব্যাপী মানববিস্তারের মানচিত্র ০-৫০ স্কেলে নীল থেকে লাল রঙ দিয়ে প্রদর্শিত
(b) ১৯৯৩-২০০৯ সময়কালে পৃথিবীর বিভিন্ন এলাকার বিজনভূমির উন্নতি অবনতি দেখানো হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল বিরানভূমি সংগায়িত করা হবে কিভাবে? আদিমযুগের প্রাকৃতিক ভূচিত্রকে আদর্শ ধরে একে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে যা মূলত মানবসৃষ্ট প্রভাবের ব্যাঘাতমুক্ত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নিউইয়র্ক সিটিকে এই তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর ২৩% স্থলভাগকে বিজনভূমির আধীনে রাখা গেছে যার আয়তন প্রায় ৩০.১ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার যা মূলত উত্তর আমেরিকা, উত্তর এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়া জুড়ে বিস্তৃত। এই আয়তনটুকু ১৯৯৩ সালে নেয়া উপাত্ত থেকে ৩.৩ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার কম। কল্পনা করুন ভারতের সমান আয়তনের জায়গা পৃথিবীজুড়ে আমরা নষ্ট করে ফেলেছি। এই বিধ্বংসের হার পৃথিবীতে ১০ শতাংশ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৩০ শতাংশ এবং আফ্রিকায় ১৪ শতাংশ।

ওয়াটসন এবং অন্যান্যরা মনে করেন এমনটা চলতে থাকার কারণ, সরকার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো প্রায়ই ক্ষতিগ্রস্ত বা গুরুতরভাবে হুমকির মুখে থাকা আবাসস্থলগুলোর প্রতিরোধ প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু দূরবর্তী ভূমিগুলো যে স্বনির্ভর কৃষক ও খনি শ্রমিকরা অধিগ্রহণ করে, সে দিকটা বিবেচনায় আনা হয় না।

দূরবর্তী প্রবাল প্রাচীরগুলোয় করা গবেষণাকাজ আমাদের কারণটা বলে দেয় কেন আদিম ভূমিগুলো জীববৈচিত্র্যের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ এবং অনুসিদ্ধান্ত পাওয়া যায় যে অন্যান্য বিজনভূমিগুলো কেন রক্ষা করা দরকার। মাদাগাস্কারের আন্টানানারিভোতে ওয়াইল্ডলাইফ কনজার্ভেশন সোসাইটিতে থাকা গবেষক স্টেফানি ডি আগাটা গবেষণা করে পেয়েছেন যে, সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে ভাল ব্যবস্থাপনায় রাখা সামুদ্রিক এলাকায়ও জীববৈচিত্র্যের প্রকারভেদের ঘাটতি রয়েছে। জুনে, নেচারে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে তিনি এমন কিছু প্রবালপ্রাচীরযুক্ত সামুদ্রিক এলাকার জীব না খুঁজে পাওয়ার কথা প্রকাশ করেছেন যা সংরক্ষিত অথচ মানব প্রভাবের খুব কাছাকাছি।

এছাড়া কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে এবং স্থানীয় জলবায়ুকে সুস্থিত রেখে বিজনভূমি, অবশ্যই বনাঞ্চলগুলোকে সংরক্ষণ করে অবস্থার উন্নতি করা সম্ভব। সময়ের সাথে এই প্রয়াস চালু থাকলে জলবায়ুর সাথে খাপ খাওয়ানো যাবে। এই সবগুলো এলাকাকে রক্ষা করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের সমাধান বের বাস্তবায়িত হবে। শুধুমাত্র বনাঞ্চল সসংরক্ষণ করা গেলেও আমরা জলবায়ুর ৫০ শতাংশ সমাধান করে ফেলতে পারব।

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!