পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাইমেট এখন বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে

পূর্বদেশীয় গরিলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাইমেট। গবেষকরা বলছেন এটি এখন অতিবিপন্ন তালিকায় সমালোচিত, যা কিনা সম্পূর্ণ বিলুপ্তির এক ধাপ নিচে মাত্র। প্রাইমেট একটি বর্গের নাম, এর অধীনে ৬৩৩টি প্রজাতি রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অফ নেচার (আইইউসিএন) এর মতে বর্তমানে ৫০০০ পূর্বদেশীয় গরিলা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে গবেষকরা এই গরিলার প্রজাতিকে বিপন্ন থেকে অতিবিপন্ন তালিকায় ঘোষণা করেছেন। আইইউসিএন এর মতে গত দুই দশকে ৭০ শতাংশ গরিলা হ্রাস পেয়েছে। এছাড়া পূর্বদেশীয় গরিলাদের বাসস্থান যে ভৌগোলিক এলাকায় সেখানকার চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে এই ক্রমহ্রাসকে ঠেকানো যাচ্ছে না।

আইইউসিএনের ডিরেক্টর জেনারেল ইঙ্গার এন্ডারসনের এ বিষয়ে বলেন, “আমাদের অন্যতম নিকটাত্মীয় প্রাইমেট- পূর্বদেশীয় গরিলাকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে দেখা সত্যিকার অর্থেই হতাশাজনক। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যা ভীষণ পরিবর্তনশীল এবং প্রতিবার আইইউসিএন এর রেডলিস্ট হালনাগাদ করার পর আমরা বুঝতে পারি বৈশ্বিক বিলুপ্তি সংকট উত্তরোত্তর কতটা ধেয়ে চলেছে।

এটা বনমানুষদের জন্য একটা হিমশীতলকর বার্তা যে, ছয়টি বড় প্রজাতির বনমানুষদের মধ্যে চারটিই অতিবিপন্ন তালিকার অন্তর্ভুক্ত: পূর্বদেশীয় গরিলা, পশ্চিমদেশীয় গরিলা, বর্ণিও ওরাং-ওটাং এবং সুমাত্রা ওরাং-ওটাং। একের পর অতিবিপন্ন তালিকায় জুড়তে থাকা প্রাণীর অর্থ হচ্ছে অন্যান্য প্রজাতিরাও অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছে, অদূর ভবিষ্যতেই বন্যদশা থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।

প্রাইমেটদের মধ্যে শিম্পাঞ্জি এবং বনোবোকে (বনোবো এক ধরনের বনমানুষ, অপর নাম পিগমি শিম্পাঞ্জি) বিপন্ন তালিকায় স্থান দেয়া হয়েছে। বিপন্ন তালিকায় থাকার অর্থ অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকি বিদ্যমান এই প্রাণীদের ক্ষেত্রে।
পূর্বদেশীয় গরিলাদের দুইটি উপপ্রজাতিতে ভাগ করা হয়: গ্রাউয়েরের গরিলা (অপর নাম পূর্বদেশীয় নিম্নভূমির গরিলা) এবং পাহাড়ি গরিলা। ধরা হয়, এখন পর্যন্ত ৮৮০টি পাহাড়ি গরিলা বেঁচে আছে পৃথিবীতে এই মূহুর্তে।

পৃথিবীজুড়ে বর্তমানে প্রাইমেটদের বাসস্থান

পৃথিবীজুড়ে বর্তমানে প্রাইমেটদের বাসস্থান

অধিকাংশ পূর্বদেশীয় গরিলার বাস কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের গৃহযুদ্ধ, সরকারের দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সব মিলিয়ে গরিলাদের বসবাসের পরিবেশের ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশাবাদ অবশ্য ভিন্ন কথা বলছে। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলে এখানে ইকোট্যুরিজম ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠতে পারে- যেমনটা উগান্ডা এবং রুয়ান্ডাতে রয়েছে। ইকোটুরিজম হচ্ছে পরিবেশ, বন্যপ্রাণীকে ভিত্তি করে গড়ে ওঠা পর্যটন ব্যবস্থা। এটা করা সম্ভব হলে হয়ত গরিলাদের সংখ্যা বাড়বে।

যদিও সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবুও হয়ত আমরা ভয় করা মেঘের পেছনের সূর্যের জন্য আশা রাখতেই পারি। কারণ, সাম্প্রতিক সময়েই আমরা জায়ান্ট পান্ডার সংরক্ষণে সাফল্য অর্জন করেছি। সর্বশেষ প্রকাশিত তালিকায় জায়ান্ট পান্ডাকে বিপন্ন তালিকা থেকে এক ধাপ নামিয়ে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ পান্ডার জন্য আমরা বন্য পরিবেশ ফিরিয়ে এনে দিতে পারছি বা আমাদের চেষ্টা কাজ করচেহ- এইটুকুও কম পাওয়া নয়। হয়ত মোটেও যথেষ্ট নয়, কিন্তু আমরা সেদিকে যে অগ্রসর হতে পারছি তার একটা ইঙ্গিত বহন করে এই খবর।

গত দশ বছরে জায়ান্ট পান্ডার সংখ্যা বেড়েছে ১৭ শতাংশ, যার দুই-তৃতীয়াংশ এখন বসবাস করছে চীনের কড়া সংরক্ষিত এলাকায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন বর্তমানে প্রায় ২০০০ জায়ান্ট পান্ডা বন্য দশায় আছে। আইইউসিএনের মতে বন সংরক্ষণ এবং বনায়ন সৃষ্টি জায়ান্ট পান্ডার সংখ্যা বৃদ্ধিকে সম্ভব করে তুলেছে। বন্যপ্রাণীরা তো আমাদের মত এপার্টমেন্ট এর সাথে খাপ খাওয়াতে পারবে না! বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের উপায় হল তাদের বসবাসের জন্য আরো জায়গা করে দেয়া ও খাদ্য নিরাপত্তা দেয়া। আর এর উপায় হল- বনায়ন ও বন সংরক্ষণ। একটি জায়ান্ট পান্ডার খাদ্যচাহিদা ১২.৫ কেজি বাঁশ।

আমরা যদি পান্ডার জন্য সফলতা অর্জন করতে পারি তবে কেন অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য পারব না?

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার সাথে ক্রমশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ছে। যদি আমাদের প্রচেষ্টাকে সর্বাত্মকভাবে কাজে লাগাতে পারি – তবে এটাও সম্ভব।
একটা নতুন গ্রহকে বাসযোগ্য করার স্বপ্ন দেখতে পারলে আমাদের নিজেদের গ্রহটাকে বাঁচিয়ে রাখার ক্ষমতাও আমাদের আছে।

Sciencealert অবলম্বনে

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!