ভুপাল গ্যাস বিপর্যয়ঃ ন্যায়বিচারের মন্থর এক সাধনা

ভুপাল- ভারতের মধ্য প্রদেশ রাজ্যের রাজধানী এবং ভুপাল জেলা ও ভুপাল বিভাগের প্রশাসনিক সদর দপ্তর। সাবেক ভুপাল রাজ্যের রাজধানী ছিল এই ভুপাল। ভারতের অন্যতম সবুজ এই নগরী এবং অসংখ্য কৃত্রিম ও অকৃত্রিম হ্রদের জন্য একে আখ্যায়িত করা হয় ‘হ্রদনগরী’ নামে।

১৯৮৪ সালের ২-৩ ডিসেম্বর রাতে প্রকৃতির এই সুন্দর নগরীতে ঘটে যায় এক অবিস্মরণীয় ঘটনা- ‘ভুপাল গ্যাস দুর্ঘটনা’। পৃথিবীর ইতিহাসে আজ অবধি ঘটে যাওয়া শিল্পকৌশল বিপর্যয়গুলোর মাঝে এটি প্রথম স্থানে অধিকার করে আছে। কি ঘটেছিল সেই রাতে? মানবতা আর ন্যায়বিচারের ইতিহাসে এই ঘটনাটি কেন এতটা আলোড়ন সৃষ্টিকারী? এসব নিয়েই আজকের লিখা।

১৯৩৪ সালে গঠিত ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড (ইউসিআইএল) ছিল একটি বিবিধ পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। ইউসিআইএল পাঁচটি বিভাগে মোট চৌদ্দটি কারখানা স্থাপন করে। মধ্য প্রদেশের রাজধানী ভুপালে ১৯৬৯ সালে কারখানা স্থাপন করা হয় এবং এতে উৎপাদন সুবিধা চালু করা হয় ১৯৭৯ সালে। এই কারখানাটিতে কীটনাশক উৎপাদন করা হত ভারতে ব্যবহারের জন্য। এর উদ্দেশ্য ছিল দুটি। প্রথমত ভারতের কৃষি ক্ষেত্রে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দ্বিতীয়ত বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা হিসেবে এটি যেন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।

 

ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড

দুর্ঘটনার রাতে কমপক্ষে ৩০ টন মিথাইল আইসোসায়ানেট (CH₃NCO) নামক একটি অত্যন্ত বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরিত হয়। সেই রাতে মিথাইল আইসোসায়ানেট ট্যাংকে পানি ঢুকে গ্যাস নির্গত হয় এবং অন্যান্য আরও অনেক কমবেশি বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়। কীটনাশক কারখানার চারপাশে বস্তি থাকায় বিষাক্ত গ্যাসের প্রকোপে পড়েন ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। নির্গত গ্যাস মাটির কাছাকাছি রয়ে যাওয়ার কারণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাঝে বমি বমি ভাব, চোখ ও গলায় প্রদাহের সৃষ্টি হচ্ছিল এবং অনেকের মৃত্যুও ঘটে। মৃতের সংখ্যা আনুমানিক হিসেবে ৩,৮০০ থেকে ১৬,০০০ এর মাঝে পরিবর্তিত হয়েছিল যদিও সরকারী তথ্য অনুযায়ী বছরব্যাপী মৃতের সংখ্যা ছিল ১৫,০০০। বিষাক্ত পদার্থসমূহ এখনও পরিবেশে বিদ্যমান, এমনকি, দুর্ঘটনার তিন দশক পরে এসে আজও আক্রান্ত ব্যাক্তিদের অনেকেই শারীরিক এবং মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম দিচ্ছেন। কয়েক দশক যাবত অধিবাসীদের প্রচেষ্টায় এলাকাটি পরিষ্কার হয়ে আসছিল কিন্তু মিশিগান ভিত্তিক ডাউ কেমিক্যাল ২০০১ সালে ইউনিয়ন কার্বাইডের উপর কর্তৃত্ব বহাল করলে সেই প্রক্রিয়াগুলোও ধীর হয়ে যায়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্যমতে এখনও ভূগর্ভে বিপজ্জনক বর্জ্য পদার্থ রয়ে গেছে এবং সরকারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এলাকাটি দূষিত। তাই দীর্ঘমেয়াদী কোনো রোগ সংক্রান্ত গবেষণা এখনও নিখুঁতভাবে প্রমাণ করতে পারে নি যে জন্মগত ত্রুটিগুলো সরাসরি দূষিত পানি পানের সাথে সম্পর্কিত।

ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশনের একটি অনুসন্ধানী দল দুর্ঘটনার কয়েকদিনের মধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তদন্ত শুরু করতে পারে নি কারণ ইতিমধ্যে ইন্ডিয়ান সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন বিষয়টির দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। এরই সূত্র ধরে তারা কারখানাটি সীলগালা করে দেয়, এর সমস্ত নথিপত্র বাজেয়াপ্ত করে এবং ঘটনার রাতে দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের যে কোনো ধরণের সাক্ষাৎকার প্রদানও নিষিদ্ধ করে দেয়। যেটা জানা যায় যে ঘটনার ছয় সপ্তাহ পূর্বে মিথাইল আইসোসায়ানেট ইউনিটটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সে সময় মিথাইল আইসোসায়ানেট সংরক্ষণের ট্যাংক ৬১০ যা থেকে গ্যাস নির্গমনের ঘটনা ঘটেছিল সেটি সরানো হয়েছিল।

শেষ পর্যন্ত তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় যে ঠিক কি কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছিল?

ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশনের একটি প্রারম্ভিক তদন্তের মাধ্যমে জানা যায় যে মিথাইল আইসোসায়ানেট ট্যাংক ৬১০ তে প্রচুর পরিমাণ পানির উপস্থিতি ছিল। এর কারণেই সংঘটিত বিক্রিয়ার ফলাফল হিসেবে প্রেসার রিলিজ ভালভটি খুলে গিয়ে গ্যাস নির্গত হয়।

মিথাইল আইসোসায়ানেট ট্যাংক ৬১০

যাতে নতুন করে আক্রান্ত না হয় সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার ছিল। জনাব দস্তগীর খুব দ্রুতই কন্ট্রোল রুমে সকল অফিসারকে জানিয়ে দিলেন ব্যপারটা এবং এর মাধ্যমে সব ধরণের রেলসেবা স্থগিত করা হয়। পরিত্রাণ আর আশ্রয়ের এক পথ হওয়ার বদলে স্টেশন ক্রমেই হয়ে উঠেছিল এক করুণ দুঃখ-দুর্দশা আর মৃত্যুপুরী। পরিবহনের আর কোনো রাস্তা অর্থাৎ কনো বাস বা রিকশা বা ট্যাক্সি কিছুই ছিল না। ভয়ার্ত মানুষেরা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আশায় কেবলই রেল স্টেশনে ছুটে আসছিল। অসুস্থ আর আক্রান্ত মানুষের ভিড়ে স্টেশন ক্রমান্বয়ে পরিণত হয়েছিল হাসপাতালের এক বিশাল জরুরী বিভাগে। দস্তগীর এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন অসুস্থদেরকে সান্তনা আর সাহস দেওয়ার জন্য। নিকটস্থ সকল স্টেশনে এসওএস পাঠিয়েছিলেন তিনি। তার নিজের অবস্থারও অবনতি হচ্ছিল যদিও সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপ ছিল না। এমনকি তার স্ত্রী এবং চার ছেলে এমন একটি শহরে ওই মুহূর্তে ছিলেন যেটি গ্যাসের বিষক্রিয়ায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। এরকম একজন নিষ্ঠাবান সরকারী চাকুরে সম্পর্কে তার স্ত্রীর মন্তব্য ছিল, “উনি আগে থেকেই এরকম। আমি এরকমই দেখে এসেছি। একবার এক দুর্ঘটনার কারণে টানা তিনদিন তিনি বাসায় ফেরেন নি।”

প্রায় পনের বছর হতে চলল গোলাম দস্তগীর মারা গেছেন। জীবনের শেষ ১৯ বছরের অধিকাংশ সময়ই তাকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালের রুমে। বিষাক্ত ধোঁয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে তার গলায় তৈরী হয়েছিল বেদনাদায়ক টিউমার। চার ছেলের মাঝে একজনের মৃত্যু ঘটে দুর্ঘটনার অব্যবহিত পরেই। তার আরেক সন্তান বেঁচে থাকেন ত্বকের ইব্র সংক্রমণের মধ্য দিয়ে।

জনাব দস্তগীরের স্ত্রী বলেছেন, “আমি ওনাকে প্রথম থেকেই এরকমই দেখে এসেছি। একবার এক দুর্ঘটনার জন্য উনি টানা তিনদিন বাসায় ফেরেন নি।”

 

জনাব দস্তগীরের স্ত্রীর বলেছিলেন যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে তার কাজের পুরষ্কার দেয় নি। তিনি তার দায়িত্ববোধ আর প্রতিশ্রুতিশীল কাজের স্বীকৃতি পান নি।

১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বরের ভয়াল রাতে মানবতার খাতিরে যারা নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন তাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একটি ফলক উন্মোচন করে। দুঃখজনক হলেও এটা সত্যি যে সেই তালিকায় এক অসামান্য অগোচরের নায়ক “গোলাম দস্তগীর” এর নাম ছিল না।

ওয়ারেন এম অ্যান্ডারসন

ওয়ারেন এম অ্যান্ডারসন ইউনিয়ন কার্বাইড কর্পোরেশনের শীর্ষ স্থান অধিকার করেছিলেন। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ২৯ সেপ্টেম্বর। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর।

ভুপাল দুর্ঘটনার মাত্র চার দিনের মাথায় ভারতে এসে যে সাহসের পরিচয় তিনি দিয়েছিলেন তার দরুন তিনি অত্যন্ত প্রশংসিত হয়েছিলেন। ভুপালে এসে তিনি অবিলম্বে গ্রেপ্তার হন। দ্রুত জামিনে মঞ্জুর হয়ে যাওয়ার কারণে তিনি মুক্তি পান এবং আর কখনোই ফিরে আসেন নি।

ভারত সরকারের বারবার অনুরোধ ছিল তাকে যোগ্য কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পন করার এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে পলাতক ঘোষণা করা হয়। তৎকালীন একজন বিচারক তাকে আত্মগোপনকারী আখ্যা দেন।

একজন সৎ বা মহৎ নেতা তিনি কখনোই ছিলেন না। বিচারের উর্ধ্বেই ছিলেন। এতগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণের দায়ভার নেওয়ার দায়িত্ব কারই বা ছিল। তবে তিনি নিজের জাত চিনিয়ে গেছেন তার খুব প্রিয় এক চাইনিজ প্রবাদের মাধ্যমেঃ “নেতা সবচেয়ে সফল তখনই যখন কর্মীরা শুধু এটুকু জানে যে নেতা আছেন। ”

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!