Malnutrition:অপুষ্টি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আমাদের করণীয়

সুপ্রিয় বন্ধুরা আশা করি সবাই ভাল আছেন। অনেকদিন পর আপনাদের সাথে কথা হবে আজকে।

আজকে যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলব সেটাকে বলা যায় পৃথিবীতে বর্তমানে একটা বড় সমস্যা। সেটা কী, কেন হয়, ক্ষতিকর প্রভাব এবং আরও কিছু সম্পর্কিত কথাবার্তা থাকছে আজকের আলোচনায়।

আজকের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে অপুষ্টি যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ম্যালনিউট্রিশন। আগে বোধহয় জানা উচিৎ যে পুষ্টি কাকে বলে।

বেঁচে থাকার জন্য আমরা খাওয়াদাওয়া করি এবং সে খাদ্য আমাদের শরীর গ্রহণ করে তাকে উপযুক্ত পদ্ধতিতে ব্যবহার করে যার মূল উদ্দেশ্য থাকে আমাদের বৃদ্ধি এবং কোষের ক্ষতিপূরণ যাতে হয়। এই পুরো ব্যাপারটাকে আমরা সোজাভাবে পুষ্টি বলতে পারি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুষ্টি বলতে এ সম্পর্কিত পড়াশোনা বা শুধু খাবারকেই বোঝানো হয়।

কিন্তু পুষ্টিরও ভাল মন্দ আছে। যেমন কেউ যদি তার দেহের প্রয়োজনানুযায়ী সঠিক খাদ্য পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করার পাশাপাশি যথাযাথ পরিমাণে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করেন তাহলে বলা যায় সেটা বেটার নিউট্রিশন আর সেটাকেই বলব পুষ্টির অভাব যা আমাদেরকে সঠিক মানসিক এবং শারীরিক উন্নতি সাধন থেকে দূরে রাখে, আমাদের কাজ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কমিয়ে দেয় এবং যার ফলে রোগব্যাধির প্রতি আমাদের সহনশীলতা কমে যায় অর্থাৎ শরীর খুব রক্ষণাত্মক অবস্থা বজায় রাখতে পারে না অসুস্থ হলে।

এই তো গেল মোটামুটিভাবে পুষ্টি কী।

এবারে তাহলে চলুন জেনে নেওয়া যাক অপুষ্টি কাকে বলে।

এরকম তো হতেই পারে তাই না যে কেউ একজন খাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু যা দরকার তা খাচ্ছেন না অথবা যতটা দরকার ততটা খাচ্ছেন না অথবা খাচ্ছেন এবং পরিমানও ঠিক কিন্তু তার শরীর খাওয়াটাকে ব্যাবহার করতে পারছে না। এসবের অন্তত একটাও যদি হয়ে থাকে তবে বলা যায় তিনি পুষ্টিতে ভুগছেন। আবার এমনও হতে পারে যে একজন ব্যক্তি খুব বেশি পরিমাণে খাচ্ছেন কিন্তু ওই অতিরিক্ত খাবারও তার নিত্যদিনের যে চাহিদা তা মেটাতে পারছে না তাহলে সেটাও অপুষ্টি।

 

 

 

অপুষ্টির কারণসমূহ

চলুন দেখে আসা যাক কোন বিষয়গুলো কাজ করেছে অপুষ্টির পিছনে।

·         স্বল্প পরিমাণে খাবার গ্রহণ করলে অথবা গ্রহণ করা খাবার যদি দেহের চাহিদা মেটাতে না পারে তখন ধীরে ধীরে এই ব্যাপারটা অপুষ্টির পর্যায়ে চলে যায়। এটা হতে পারে একজন ব্যক্তি খাবার গেলার সময় ঠিক স্বাভাবিক অনুভব করছেন না বা অসুস্থতা থেকে সেরে উঠার সময় তিনি পর্যাপ্ত পরিমাণে খেতে পারছেন না।

·         কিছু কিছু মানসিক রোগের ক্ষেত্রে যেমন ডিপ্রেশন অথবা সিজোফ্রেনিয়া হলে একজন ব্যক্তি এমন একটা কঠিন মানসিক পর্যায়ে চলে যান যে তিনি নিজের দিকে কোনো ধরণের খেয়াল বা যত্ন করতে পারেন না, এর ফলে দেখা যায় যে তিনি অপুষ্টিতে ভুগছেন।

·         কখনও কখনও দেখা যায় যে একজন মানুষ দিব্যি খাচ্ছেন ঠিকমত কিন্তু তারপরও কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে  এর কারণ হতে পারে তিনি কোনো ধরণের পরিপাক সমস্যায় ভুগছেন অর্থাৎ তিনি যে খাবার খাচ্ছেন তা ঠিকমত পরিপাক করতে পারছে না তার পরিপাকতন্ত্র। যেমন: Crohn’s Disease বা Ulcertive Colitis

·         ডিমেনশিয়া এমন একটা সমস্যা যখন আক্রান্ত ব্যক্তির যোগাযোগ ক্ষমতা কমে যায় অর্থাৎ ধরা গেল তার এখন খেতে হবে কিন্তু এই চাহিদার সাথে তার করণীয় কি হবে সেটা মেলাতে পারেন না।

·         একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে কারও কারও ক্ষেত্রে সেটা হল ভীতি বা সম্পূর্ণ অমূলক চিন্তা। খেতে গেলে চিন্তা,ওজন বাড়লে চিন্তা। এদের সবসময়কার একটা চিন্তা থাকে যে তারা কি মোটা হয়ে যাচ্ছেন, বেশি খেয়ে ফেলছেন, অতিরিক্ত ওজন হচ্ছে ইত্যাদি। এ বিষয়টা কখনও এতটা গুরুতর হয়ে পড়ে যে খাওয়ার সময় তারা এটা চিন্তা করেন যে একটা নির্দিষ্ট খাবারে কতটা ক্যালরি আছে বা তাতে ফ্যাটের পরিমাণ কতটা? তাদের যদি কখনও মনে হয় যে তারা বেশি খেয়ে ফেলেছেন মুখে আঙুল দিয়ে জোর করে বমি করার মত ঘটনাও তারা ঘটান। এই বিষয়টাই প্রকারান্তরে অপুষ্টির জন্য দায়ী।

 

  

 

 

 

অপুষ্টির লক্ষণসমূহ

·         স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া

·         খুব অলস বা ক্লান্ত বোধ করা এমনকি একাকী অতিরিক্ত কান্নাও হতে পারে অপুষ্টির লক্ষণ

·         খুব হতাশ বোধ করা

·         মনোযোগের অভাব অর্থাৎ একটা প্রশ্ন শুনে স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় পর তার উত্তর দেওয়া

·         দেহে হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া বা হাড়ের গঠন খুব ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া

·         ত্বক খুব অস্বাভাবিক ধরণের শুষ্ক হয়ে যাওয়া এমনকি যে কোনো রকমের লোশন বা তেল ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য ব্যবহারের পরও

বাংলাদেশ এবং খাদ্য সমস্যার কিছু হালচাল

সমগ্র বিশ্বের মাঝে অপুষ্টির ক্ষেত্রে আমাদের দেশ প্রথম সারির দিকে আছে যদিও ব্যাপারটা সত্যিই দুঃখজনক। যেসব শিশু স্কুলে যাওয়া শুরু করে নি তাদের মাঝে প্রায় ৫৪% তাদের বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে,প্রায় ৫৬% আদর্শ ওজনের কম ওজনধারী এবং প্রায় ১৭% ঝরে পড়ছে। এর কারণ হিসেবে বহুলাংশে দায়ী অপুষ্টি।

খুব খারাপ লাগে শুনতে যে আমাদের দেশের শিশুরা শুধু অপুষ্টিতেই ভুগছে না বরং তারা নানা ধরণের মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস ডেফিশিয়েন্সিতেও ভুগছে। অর্থাৎ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় যেটা তাদের বৃদ্ধির জন্য, খেলাধুলা ছোটাছুটি করার কথা ঠিক সে সময়টাতে তারা অনেকেই খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাদ্য উপাদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যাদের মাঝে আছে সুনির্দিষ্টভাবে ভিটামিন এ, জিংক, লৌহ এবং আয়োডিন। তবে এটা আমাদের জন্য কিছুটা হলেও আনন্দের যে বর্তমানে আমাদের এই দেশ একটা উদাহরণ কারণ বিগত ১৫ বছরে ভিটামিন এ স্বল্পতা কমিয়ে আনার জন্য আমরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিতে পেরেছি যদিও এখনও আমরা এই বিষয়ে শতভাগ সফল নই।

আমাদের দেশের নারীদের মাঝে এখনও অপুষ্টি প্রকট আকারে বিরাজ করছে। ৫০% এর বেশি নারী ধারাবাহিকভাবে এনার্জি ডেফিশিয়েন্সিতে ভুগছেন অর্থাৎ একটা নির্দিষ্ট বয়সে তাদের যতটা কর্মক্ষম হওয়ার কথা ছিল তারা বাস্তবিকপক্ষে ততটা নন। এর একটা বড় প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের উপর যখন মা হয়েও একজন নারী পর্যাপ্ত পরিমাণে তার শিশুকে স্তন্যদান করতে পারেন না।

বলা হচ্ছে বাংলাদেশ খাদ্য সংকটের বিরুদ্ধে লড়ে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। ১৯৯০ সালে অনুর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের প্রায় দুই তৃতীয়াংশ ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওজনের কিন্তু আজকে যা কি না এক তৃতীয়াংশের নীচে নেমে এসেছে। যার ফলে বাংলাদেশ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা থেকে বিশেষ প্রাপ্তিস্বীকারের মত স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিছু দুঃখজনক বিষয় চলুন জেনে নেওয়া যাক এ জন্য যে আমাদের প্রত্যেকের উচিৎ এ বিষয়ে সচেতন হওয়া।

প্রথমত

পুষ্টির স্বল্পতার জন্য বাংলাদেশকে প্রতি বছর প্রায় একশ কোটি মার্কিন ডলারের সমমূল্যের উৎপাদনশীলতা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয় এবং এর চেয়েও বেশি খরচ হয় স্বাস্থ্য খাতে।

দ্বিতীয়ত

৪১% এর মত শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের নীচে তারা শিকার হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে অপুষ্টির এবং এর কারণে তারা তাদের বয়সের তুলনায় বেশ কম উচ্চতার হচ্ছে।

তৃতীয়ত

ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মাঝে প্রতি তিনজনে একজন রক্তস্বল্পতায় ভুগছে।

চতুর্থত

শিশুদের খাদ্যাভ্যাসের মাঝে মাত্র ২৫% ক্ষেত্রে এক ধরণের বৈচিত্র খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে প্রতি সাতজনের মাঝে চারজনেরই খাদ্যভ্যাস খুবই সাধারণ পর্যায়ের বা বলা ভাল একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি।

এছাড়া আরও কিছু ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে স্কুলগামী বাচ্চাদের ৪০% লৌহের অভাবে আছে, নারীদের মাঝে ২৪% কম ওজনের এবং ১৩% যথেষ্ট কম উচ্চতার যার কারণে তাদের জন্ম দেওয়া শিশুদেরও দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে বেশি।

সবচেয়ে কষ্টকর যে বিষয়টা আমরা মানতে বাধ্য সেটা হচ্ছে আমাদের নীচু মানসিকতা। সেটা কিরকম? আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য খাদ্য সংকটের সময় বা দুর্যোগের সময় ত্যাগ করি বা তাদের বেঁচে থাকাটাকে সুনিশ্চিত করার জন্য আমরা না খেয়ে থাকি কিংবা কম খাই। কিন্তু এরকম একটা চমৎকার জিনিসও আমরা কলুষিত না করে থাকতে পারি না কারণ এখানেও লিঙ্গবৈষম্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবে নিজের অংশটুকু বাচ্চার মুখে তুলে দেওয়া মানুষটি একজন নারীই হয়ে থাকেন।

 

 

এই বিষয়টা থেকে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে ভবিষ্যত প্রজন্ম, যারা আগামীর বাংলাদেশ গড়বে তাদের জন্য আজকের মানুষগুলোর জীবনে এটা সুনিশ্চিত করা খুব বেশি দরকার যে তারা এমন ধরণের খাবার খাচ্ছেন বা তাদের খাদ্যাভ্যাস এমন যা গুণগত এবং পরিমাণগত উভয়ভাবেই সর্বোচ্চ পর্যায়ের।

 অপুষ্টি রোধে করণীয়

·         মা ও শিশু খাদ্যের দিকে প্রাধান্য দিতে হবে

·         অল্প বয়সে গর্ভধারণ রোধ করতে হবে,নারী স্বাস্থ্যের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে

·         কমিউনিটি স্বাস্থ্য কার্যক্রমকে আরও বৃহৎ পরিসরে আয়োজন করতে হবে

·         অপুষ্টি সমাধান করার জন্য এর সাথে সম্পর্কিত ক্ষেত্রগুলোকে সঠিকভাবে সাজিয়ে নিতে হবে

·         অপুষ্টি সমাধানের জন্য এই খাতে আর্থিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করতে হবে

·         পুরো বিশ্বকে একীভূত করতে হবে এই প্রতিজ্ঞায় যে অপুষ্টির সমাধান হবেই

খুব সম্ভবত আমরা কিছুটা হলেও বুঝতে পেরেছি অপুষ্টি কতটা ক্ষতিকর এবং এর সমাধান কতটা জরুরি। আমরা যদি চাই আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে সামান্য কিছু অংশগ্রহণও পারে এ পৃথিবীটাকে বদলে দিতে। তার আগে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যে আমরা পারব এই কাজটা করতে।

আজকে এ পর্যন্তই।পরবর্তীতে কথা হবে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে; সে পর্যন্ত সবাই সুস্থ থাকুন এবং ভাল থাকুন।  

তথ্যসুত্র

https://goo.gl/1fJEmT

https://goo.gl/Xo5TLj

https://goo.gl/roCXOA

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!