মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধনে কাঁচা চা-পাতা

সেই আদিম যুগ থেকে আজ পর্যন্ত বিজ্ঞান শুধু দিয়েই যাচ্ছে। এমন সময় কি ছিলনা যখন সামান্য জ্বরেও অনেক মানুষ অকালে প্রাণ হারাত! কিন্তু বর্তমানে ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগেরও সমাধান দিয়ে যাচ্ছে এ বিজ্ঞান। যাযাবরের কথা সত্যি। নানা আবিষ্কারের মাধ্যমে বিজ্ঞান সত্যি আমাদের চমৎকার এক বেগ দিয়েছে।

আর বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য এক চমকপ্রদ বৎসর হিসেবে নজির হয়ে আছে ২০১৫। যা বিগত বছরগুলোর চেয়ে অনেক বেশী সাফল্য এনে দিয়েছে বিজ্ঞানজগতে। যার কারণে এ বছরটিকে “ইন্টারন্যাশন্যাল ইয়ার অফ সয়েলস এন্ড লাইট-ব্যয়েজড টেকনোলজি” বলে ঘোষণা করা হয়। আর এ বৎসরের এক চমকপ্রদ আবিষ্কার হল মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার কোষ নিধন।

ক্যান্সার! শুনতে কেমন ভয় ভয় লাগে! তার নামটা যেমন ভয়ঙ্কর তার ক্রিয়াকলাপও তেমন ভয়ঙ্কর। বর্তমান পৃথিবীতে সবচে আলোচিত রাক্ষস হিসেবে এর পরিচয়! শুধু তাই নয়, এ রাক্ষস আবার বিভিন্ন রুপ নিয়ে আসে। কখনো আসে ব্ল্যাড ক্যান্সার হয়ে, কখনো বা মুখ-গহ্বরীয় ক্যান্সার হিসেবে। আবার কখনো আরো মারাত্মক ব্রেন ক্যান্সার হয়েও গ্রাস করে মানবজীবন।

সময়টা ২০১৫ সালের ২৮ শে জানুয়ারী মাস। অ্যামেরিকার পার্ক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক হার না মানা পরিশ্রম করে চলছিল ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রনে। কিন্তু তাঁরা কল্পনাও করেনি যে তাঁদের গবেষণা এক চমৎকার রুপ ধারণ করবে। তাঁরা চা-পাতার মধ্যে এমন এক উপাদান খুঁজে পান যা মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দিতে সক্ষম। চলুন দেখি তাঁদের গবেষণার সুফল।

মুখের ক্যান্সার
ক্যান্সার বলতে আমরা সাধারণত বুঝি আমাদের কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি যা তার সন্নিহিত সক্রিয় কোষগুলোকে নষ্ট করে তাদের কাজে ব্যঘাত ঘটায়। আর মুখ-গহ্বর সংক্রান্ত বা মুখের ক্যান্সার হল নাক, জিহ্বা ইত্যাদি মুখ-গহ্বরীয় কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। তাছাড়া কন্ঠনালী, নাক সংলগ্ন হাড়, লালাগ্রন্থি ও থাইরয়েড গ্রন্থিতেও এ ক্যান্সার হতে পারে।
পাশের ছবিগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে হয়ত বুঝতে পারবেন।

jj

আক্রান্ত হওয়ার কারণ
অ্যালকোহল, ধূমপান, পান পাতা চিবানো, অপুষ্টি ও ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে এ ক্যান্সার হয়ে থাকে। সবচেয়ে বেশী মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হয় ধূমপান ও অ্যালকোহলের কারণে। তবে আমাদের দেশে পান খাওয়ার কারণেও এ রোগের বেশ প্রচলন।

সবুজ চা-পাতা
সবুজ চা-পাতা আমরা “ক্যামেলিয়া সিনেসিস” Camellia sinensis নামক এক উদ্ভিদ থেকে পেয়ে থাকি যার উৎপত্তি চীনে। আমাদের দেশে এটি ‘চা-পাতা’ বলে বহুল ব্যবহৃত। এ চা-পাতার রাসায়নিক উপাদান দেখলে বুঝা যাবে এটা আমাদের কতটা উপকারী! একে ঔষুধি উদ্ভিদ বলেও অনেক বিজ্ঞানী সম্বোধন করেন।

hjj

এর পাতায় ক্যাফেইন, থিউপাইলিন, থিউব্রোমিন ও থিয়ানিন জাতীয় অ্যালকালয়েড রয়েছে। ভিটামিন ই এবং সি, পটাশিয়াম ইত্যাদি পুষ্টিকর কিছু উপাদানও রয়েছে এ উদ্ভিদে। এছাড়া ফ্ল্যভান-৩-অল, গ্যালিক এসিড, ক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন, ইপিক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইসিজি), ইপিগ্যালোক্যাটসিন, ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক কিছু জটিল রাসায়নিক উপাদান বিদ্যামান। যা বিভিন্ন রোগের ঔষুধ হিসেবে কাজ করে।

যেভাবে এ ক্যান্সার কোষ নিধন করবে
পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জুশোয়া ল্যামবার্ট বলেন, সবুজ চা-পাতার ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট (ইজিসিজি) নামক উপাদানটি মুখের ক্যান্সার কোষকে নষ্ট করে দেয় তবে তা একদম শুরুর পর্যায়ে। যখন আমাদের কোষে ক্যান্সার বাসা বাধার জন্য কাজ শুরু করবে, ঠিক তখনই কাজ দিবে এ উপাদানটা। যাতে করে এ ক্যান্সার কোষের সন্নিহিত কোন কোষকে ক্ষতি না করে। তিনি আরো জানান ইজিসিজি ক্যান্সার কোষের সাথে এক প্রকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যা এ কোষকে নষ্ট করে দেয়।

hjhj

ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, একটা চাক্রিক গঠন তৈরী করে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ডিয়ার সাথে ক্রিয়া করে নষ্ট প্রক্রিয়া শুরু করে। গবেষক ল্যামবার্ট বলেন, “ ক্রিয়া চলাকালে ইজিসিজি একটা সক্রিয় অক্সিজেনের গ্রুপ হয়ে কাজ করে ক্যান্সার কোষের মাইটোকন্ড্রিয়াকে নষ্ট করার চেষ্টা করে। শুরু হয়ে যায় ইজিসিজি এবং ক্যান্সার কোষের মাইট্রোকন্ড্রিয়ার যুদ্ধ। ইসিজিকে নিয়ন্ত্রন করতে মাইটোকন্ড্রিয়া আরো বেশী প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে ক্যান্সার কোষের এন্টি-অক্সিডেন্ট জিন স্ফুটন বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সে তো জানেনা ইজিসিজি কতটা শক্তিশালী! এসময়ে ইজিসিজি অক্সিডেটিভ নিয়ামক প্রদান করে। যাতে করে ক্যান্সার কোষ নিধন হয়। অক্সিডেটিভের প্রভাবে ক্যান্সার কোষ নিয়ন্ত্রনহীন হয়ে পড়ে এবং তার প্রতিরক্ষাও হ্রাস পায়। ফলস্বরুপ নষ্ট হয়ে যায় ঊক্ত ক্যান্সার কোষ।”

ll

গবেষকরা আরো বলেন, সিরটুইন-৩ নামক প্রোটিনকে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় করতে ইজিসিজি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইপিগ্যালোক্যাটসিন-৩-গ্যালাট, ক্যান্সার কোষের প্রোটিনকে নিষ্ক্রিয় এবং স্বাভাবিক কোষের প্রোটিনকে সক্রিয় করে দেয়। তাছাড়া তাঁরা আরো জানান যে, স্বাভাবিক কোষের প্রতিরক্ষাকারী কিছু উপাদানের কারণে ইজিসিজি তাদের নষ্ট করতে পারেনা।
পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া ছাড়া এরকম একটা ঔষুধ আবিষ্কার করতে পেরে পার্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা খুব খুশি। আর এভাবে এগিয়ে যাবে বিজ্ঞান। আবিষ্কার করে যাবে আরো মারাত্মক মারাত্মক রোগের ঔষুধ। সহজ করে দিবে আমাদের জীবন-যাত্রাকে। জয় বিজ্ঞানের।

সুত্রঃ

1. http://www.wikipedia.org/oral_cancer
2. http://news.psu.edu/story/342487/2015/01/28/research/green-tea-ingredient-may-target-protein-kill-oral-cancer-cells
3. http://bn.wikipedia.org/
4. Pean university recerch center.

লিখেছেন- ফৌজুল ফাহাদ

Facebook Comments
Please follow and like us:
250

BSS ADMIN

২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারী পথ চলা শুরু বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটির। বাংলাদেশকে একটি আধুনিক বিজ্ঞান মনষ্ক রাষ্ট্রে পরিণত করাই একমাত্র লক্ষ্য বাংলাদেশ সায়েন্স সোসাইটির। দেশের বিভিন্ন স্থানে বিজ্ঞান ভিত্তিক নানা অনুষ্ঠান ও নানা কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের আগামী ভবিষ্যৎ এর কাছে বিজ্ঞানকে আরো মজার ও সহজবোধ্য ভাবে উপস্থাপনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান সোসাইটি।

You may also like...

1 Response

  1. wow wonderfull bollei cholbena …!
    Asole amar iccha je apnader moto ekjon scince technology goveshok hobo amar jonno duwa korben ami o ekta kaj niye Reserch kortechi inshaallah kunu din dekha hoye jete pare

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!